পিচ্ছিল পথে অর্থনিতি জিবন-জিবিকা রক্ষায় জন-প্রতাশা

২০২১ সাল আমাদের ইতিহাসের একটি বিশেষ মাইলফলক, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। ভঙ্গুর অর্থনীতি আর নাজুক সামাজিক অবকাঠামো থেকে বর্তমান অবস্থায় উত্তরণ আজ দেশের মানুষ ও রাষ্ট্রের প্রশংস- নীয় অর্জন। সরকারের লক্ষ্য এখন ২০৩০ সালের মধ্যে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ থেকে উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছানো ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নিশ্চিত করা। তবে অগ্রগতির এই ধারা অনেকটা হোঁচট খেয়েছে কোভিড-১৯ জনিত অতিমারির কয়েক দফা আঘাতে, যার ‘আফটার ইফেক্ট’ এখনো রয়ে গেছে।

কোভিড ও লকডাউনের প্রভাবে ব্যাপক কর্মহীনতা ও আর্থিক ক্ষতি এবং মৃত্যু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি দেশের অসংখ্য মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্য ঝুঁকিতে ফেলেছে। দারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে- ২০.৫ শতাংশ থেকে ৩৬.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে কোভিড শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত / উচ্চ-মধ্যবিত্ত সহ সকলকেই কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কেবল শহরেই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও কোভিড দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। কর্মহীন শহর ফেরত নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠি ছাড়াও গ্রামীণ কৃষি-অর্থনীতিতে বিদেশ ফেরত প্রবাসী শ্রমিকদের চাপ নিতে হয়েছে। অন্যদিকে কোভিড অতিমারির মারাত্মক প্রভাব যেতে না যেতে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা স্বরুপ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব চেপে বসেছে দেশের অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের অস্থিরতার ফলে ভোজ্য তেল, গম, পশুখাদ্য, জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছর মওসুমের আগেই অতিবৃষ্টি ও বন্যার মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগের বাৎসারিক অভিঘাত এদেশের কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে জীবিকার সংকট ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির মুখে ফেলেছে। এই ত্রিশংকু অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি দরকার মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা কৌশল।

জুন মাসে সরকার নতুন বছরের বাজেট ঘোষণা করবেন। সুতরাং এই বহুমুখী সংকট মোকাবেলায় দারিদ্র্যসীমার মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠীসহ নতুন করে দারিদ্র্য ঝুঁকিতে থাকা সম্ভাব্য জনগোষ্ঠীর জন্য অতিদ্রুত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা না করলে বাংলাদেশের এ পর্যন্ত সকল অর্জন ম্লান হয়ে যাওয়ার আশু ঝুঁকি এড়ানোর সুযোগ নেই। এজন্য প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো প্রকল্প নির্ভর কেন্দ্রীয় উদ্যোগের পরিবর্তে দরকার বিকেন্দ্রী কৃত, গভীর ও সম্প্রসারণমুখী, অধিকারভিত্তিক একটি সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার ধারণা, কাঠামো ও প্রক্রিয়া।

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ব্যবস্থার দাবি তুলে আসছে। জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলে ইতিমধ্যে সরকারের একটি নীতিগত অবস্থানের আভাস পাওয়া গেছে। এখন দরকার একটি সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার বহিঃপ্রকাশের একটি বড় মাধ্যম হলো জাতীয় বাজেট। আসছে ‘জাতীয় বাজেট’ নামক এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সামগ্রিক সূত্রপাত হবে বলে আমরা আশা করছি। একইসাথে আমরা মনে করি যে, গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন-এর বাজেট বিকেন্দ্রীকরণ ও জনঅংশগ্রহণের দাবি বাস্তবায়িত হলে অতিদ্রুত আমরা একটি জনকল্যানমুখী বাংলাদেশের স্বরুপ দেখতে পাবো ।