১. প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট অনেকাংশেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি হয়। তবে নারীর সমতা ও অধিকারের কথা মাথায় রেখে, ২০০৯ সালে শুরু হওয়া জেন্ডার বাজেট প্রক্রিয়া এখন দেশের বাজেট পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে Gender Budget ছিল ৳৪,৫৪,২১১.৩ কোটি টাকা, যা ৪৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নযোগ্য।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন—এই বরাদ্দের বড় অংশ প্রকল্পভিত্তিক, কেন্দ্রিক ও একমুখী। যেসব নারী গ্রামীণ, প্রান্তিক, প্রতিবন্ধী বা সামাজিকভাবে বঞ্চিত—তাদের বাস্তব চাহিদা এবং জীবনের প্রেক্ষাপট এই বাজেট কাঠামোতে স্থান পায় না। জেলাভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তি ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এখনো নানামুখী সংকটে রয়েছেন।
বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান ঘাটতি:
- লিঙ্গভিত্তিক ও বয়সভিত্তিক তথ্যের অভাব।
- প্রশিক্ষিত জনবল ও বাজেট বিশ্লেষণ সক্ষমতার ঘাটতি।
- জেলা পর্যায়ে নারীদের বাজেট প্রণয়নে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই।
- দুর্বল পরিবীক্ষণ (Monitoring) ও মূল্যায়ন (Evaluation) কাঠামো।
জেন্ডার বাজেটের প্রচলন নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং জীবিকায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করতে চাইলেও বাস্তবে কেন্দ্রভিত্তিক এবং খাতনির্ভর চিন্তাধারা স্থানীয় বাস্তবতাকে ছাপিয়ে গেছে। এই গবেষণা সেই কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে, একটি ন্যায়ভিত্তিক, জনগণকেন্দ্রিক, অংশগ্রহণমূলক বাজেট কাঠামোর পক্ষে কথা বলে—যেখানে নারীর কণ্ঠ হবে মূল চালিকাশক্তি।
২. উদ্দেশ্য ও পরিধি
এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে দেশের ৯টি ভৌগোলিক ও প্রাসঙ্গিক বৈচিত্র্যময় জেলা—ঢাকা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, নওগাঁ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, বান্দরবান ও চট্টগ্রাম—জুড়ে। অঞ্চলভিত্তিক সমাজ-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে জেন্ডার বাজেটের কার্যকারিতা, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং নারীর বাস্তব চাহিদা অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়েছে।
মূল উদ্দেশ্য:
- বিদ্যমান জেন্ডার বাজেট কাঠামোর কার্যকারিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলকতা মূল্যায়ন করা;
- প্রাতিষ্ঠানিক ও আঞ্চলিক অসামঞ্জস্য ও ঘাটতি চিহ্নিত করা;
- অংশগ্রহণমূলক ও মানবিক-ন্যায়ভিত্তিক বাজেট কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া।
এই গবেষণা অংশগ্রহণমূলকভাবে নারী, যুব, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী, এবং সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিদের সরাসরি মতামতকে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। এতে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (FGD), মূল তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার (KII), এবং গণশুনানি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই গবেষণা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে:
- Gender-disaggregated data-এর সংকট চিহ্নিতকরণে,
- স্থানীয় নারীদের কণ্ঠস্বর এবং নেতৃত্বের স্থান নিরূপণে,
- এবং স্থানভিত্তিক সমস্যাসমূহের উপর নির্ভরশীল বাজেট বরাদ্দ প্রস্তাবনায়।
৩. গবেষণা পদ্ধতি
এই গবেষণায় মিশ্র পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যার মধ্যে ছিল:
- প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ: ফোকাস গ্রুপ আলোচনা (FGD), মূল তথ্যদাতাদের সাক্ষাৎকার (KII), এবং জেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন, সিভিল সোসাইটি সংগঠন ও সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে গণশুনানি।
- গৌণ তথ্য পর্যালোচনা: গত ৩-৫ বছরের জাতীয় বাজেট দলিল, প্রকল্প ডেটাবেস, নীতিমালা এবং সিভিল সোসাইটি সংগঠনের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ।
- স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ততা: নারী, যুব, আদিবাসী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর যাতে অর্থবহভাবে প্রতিফলিত হয় তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
- গুণগত বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ: বিভিন্ন জেলার সাধারণ ধারা, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রয়োগযোগ্য তথ্য তুলে ধরতে সহায়তা করেছে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা: যদিও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিটি মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করেছে, তবে কিছু সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হতে হয়েছে:
- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বাজেট সম্পর্কিত তথ্য অনেক সময় অসম্পূর্ণ ছিল বা আলাদাভাবে উপস্থাপন করা ছিল না।
- প্রকৃত আর্থিক কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া না যাওয়ায় পরিমাণগত বিশ্লেষণ সীমিত ছিল।
- সীমিত সম্পদ ও সময়ের কারণে গবেষণার পরিধি অন্যান্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বিস্তৃত করা সম্ভব হয়নি।
৪. মূল পর্যবেক্ষণ
৪.১ জাতীয় বাজেট বিশ্লেষণ: বড় বাজেট, ছোট প্রভাব?
২০২৪–২৫ অর্থবছরের Gender Budget ছিল ৪৫৪,২১১.৩ কোটি টাকা, যা ৪৪টি মন্ত্রণালয়/বিভাগে ছড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে:
- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়: ২৮.২%
- আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ: ২৯.৩%
- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়: ২০.২%
তবে, জেন্ডার বাজেটের ৩৪.৪% উন্নয়ন বাজেটে থাকলেও পরিচালন ব্যয়ে বরাদ্দ মাত্র ৫.৬%—যা নারীদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের সুযোগকে সীমিত করে।
৪.২ আঞ্চলিক বৈষম্য ও নারীর বাস্তব চাহিদা
জেলা ভিত্তিক নারী ও যুব জনগোষ্ঠীর উপর সরাসরি মাঠপর্যায়ে পরিচালিত গণশুনানি, FGD ও KII-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে উঠে এসেছে নারীদের বাস্তব জীবনের চাহিদা, সমস্যা ও তাদের নিজস্ব প্রস্তাবিত সমাধান। নিচের সারণিতে ৯টি জেলার নারী সংক্রান্ত মূল সমস্যাসমূহ এবং জনগণের প্রাধান্যপ্রাপ্ত দাবিগুলো তুলনামূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
| জেলা | প্রধান ইস্যুসমূহ | জনগণের প্রধান দাবি |
| ঢাকা | বাজেট প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নেই, নিরাপত্তা ঘাটতি | নিরাপদ আবাসন, আইনি সহায়তা, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ |
| কুড়িগ্রাম | প্রজনন স্বাস্থ্য সুবিধার অভাব, দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব | মাতৃত্বকালীন ভাতা, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, আদালত ব্যবস্থা |
| গাইবান্ধা | গর্ভবতী নারীদের ভাতা বিলম্ব, চাইল্ড ম্যারেজ প্রতিরোধ বাজেটের অভাব | কাউন্সেলিং সেন্টার, আইটি-এগ্রি প্রশিক্ষণ, সহিংসতা থেকে পুনর্বাসন তহবিল |
| নওগাঁ | বিধবা ও মাতৃত্বকালীন প্রকল্পে বাজেট অভাব, আইনি সহায়তা সীমিত | ক্ষুদ্র ঋণ, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা |
| কুষ্টিয়া | নারী বাজেট পরিকল্পনায় অনুপস্থিত, জলবায়ু অভিযোজন প্রশিক্ষণের অভাব | কারিগরি প্রশিক্ষণ, বাল্যবিবাহ রোধ, মনিটরিং ব্যবস্থার বাজেট |
| বাগেরহাট | প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার অভাব, বাজেটে ৩৫-৫৫ বয়সী নারীদের অন্তর্ভুক্তি নেই | স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র ঋণ, নিরাপত্তা কমিটি |
| সাতক্ষীরা | লবণাক্ততার কারণে নারী স্বাস্থ্য ক্ষতি, দুর্যোগকালে আশ্রয় সংকট | নারী কর্মসূচিতে বাজেট বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ভাতা, নারী সহায়ক আদালত |
| চট্টগ্রাম | নগর বস্তিতে স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সমস্যা | নিরাপত্তা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা |
| বান্দরবান | মানসিক স্বাস্থ্য সেবার অভাব, পর্যটনে নারীর অংশগ্রহণ কম | নারী হোস্টেল, বিকল্প জীবিকা, সহিংসতা বিরোধী সচেতনতা |
৪.৩ প্রকল্পভিত্তিক নারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড
নিচের সারণিতে ৯টি জেলার নারী উন্নয়ন কার্যক্রমের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও তাদের মধ্যে ক্ষেত্রভিত্তিক অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়নের দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
| জেলা | প্রকল্প কার্যক্রম |
| ঢাকা | প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, লিঙ্গ-সাম্য উন্নয়ন, নিরাপত্তা বুথ, দক্ষতা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা |
| কুড়িগ্রাম | কৃষি প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি, স্বাস্থ্য ও অধিকার সচেতনতা, নারী ক্ষমতায়ন |
| গাইবান্ধা | নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্য প্রকল্প, নারী নির্যাতন সচেতনতা |
| নওগাঁ | কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প, জলবায়ু অভিযোজন, নারী নেতৃত্ব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারী অন্তর্ভুক্তি |
| কুষ্টিয়া | দক্ষতা উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব ও শিক্ষা অংশগ্রহণ, জলবায়ু অভিযোজন |
| বাগেরহাট | সবুজ কর্মসংস্থান, উপকূলীয় জীবিকায় নারী অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, স্থানীয় শাসনে নারী অংশগ্রহণ |
| সাতক্ষীরা | নারী কৃষিতে অংশগ্রহণ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে নারী নেতৃত্ব, মাতৃত্বকালীন সহায়তা বৃদ্ধি |
| চট্টগ্রাম | নগর পরিকল্পনায় লিঙ্গ সাম্য, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নারী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ |
| বান্দরবান | পাহাড়ি অঞ্চলে নারী ক্ষমতায়ন, সহিংসতা সচেতনতা, বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নারীর অন্তর্ভুক্তি |
৫. কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা
জাতীয় জেন্ডার বাজেটের কার্যকারিতা এখনও অনেক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জে সীমাবদ্ধ। মাঠপর্যায়ের অংশগ্রহণ ও প্রভাব নিশ্চিত করতে হলে নীচের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত ও দূর করা জরুরি:
৫. ১. জেন্ডারভিত্তিক বিশ্লেষণযোগ্য তথ্যের ঘাটতি
- বেশিরভাগ মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নারী-পুরুষ, বয়স ও প্রতিবন্ধিতা ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করে না।
- পরিকল্পনা ও বরাদ্দ হয় প্রায়শই একজন ‘গড় নারী’র জন্য, যা প্রান্তিক নারীর বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না।
- শিশু, কিশোরী, তৃতীয় লিঙ্গ বা আদিবাসী নারী—এদের জন্য আলাদা বরাদ্দ নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে: বরাদ্দ সুনির্দিষ্ট নয়, মূল্যায়ন অসম্ভব।
৫. ২. দক্ষ জনবল ও প্রশিক্ষণের অভাব
- স্থানীয় পর্যায়ে জেন্ডার বাজেটিং বুঝে এমন কর্মকর্তা, পরিকল্পক বা নারী নেতৃত্ব কম।
- প্রশিক্ষণ ও নির্দেশিকা না থাকায় জেলা/উপজেলায় বাজেট তৈরি হয় পুরনো ধ্যানধারণায়।
- মন্ত্রণালয়-সামঞ্জস্য ও বাজেট বিশ্লেষণ দক্ষতাও সীমিত।
ফলে: বাজেট বাস্তবতা বিবর্জিত ও লিঙ্গ-অন্ধ থেকে যায়।
৫. ৩. দুর্বল MEL (Monitoring, Evaluation, Learning) কাঠামো
- বাজেট বরাদ্দের কার্যকারিতা বা প্রভাব মূল্যায়নের ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই।
- স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারায় প্রান্তিক নারীর বাস্তব উপকার মেলে না।
- তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়ন ও সামাজিক নিরীক্ষা চালুর সংস্কৃতি অনুপস্থিত।
ফলে: বাজেট পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ থাকে না।
৫. ৪. স্থানীয় নারীর অংশগ্রহণ সীমিত
- ইউনিয়ন, পৌরসভা বা জেলা বাজেট সভায় নারীর অংশগ্রহণ সংকটজনকভাবে কম।
- যুব নারী, কিশোরী, প্রতিবন্ধী নারী বা আদিবাসী নারীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত।
- বাজেট বোঝার সক্ষমতাও নেই, কারণ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয় না।
ফলে: বাজেট হয় কেন্দ্রভিত্তিক, জনগণবিচ্ছিন্ন।
৫. ৫. বাজেট সমন্বয় ও সময়-সংকট
- নারী সম্পর্কিত প্রকল্পগুলো বিভিন্ন বিভাগে ছড়িয়ে থাকায় সমন্বিত প্রভাব তৈরি হয় না।
- বাজেট তৈরির সময়সীমা এতই কম থাকে যে স্থানীয় মতামত নেওয়ার সুযোগ হয় না।
ফলে: পরিকল্পনা হয় তড়িঘড়ি, কাঠামোগত দুর্বলতায় ভরা।
এই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর না হলে, বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও তা কার্যকর প্রভাব ফেলবে না। সুতরাং, GoB এবং উন্নয়ন সহযোগীদের উচিত এখনই নির্দেশনা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৬. জেন্ডার বাজেট প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ (ম্যাক্রো ও মাইক্রো স্তরে)
বাংলাদেশে জেন্ডার বাজেট প্রণয়নে অগ্রগতি থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে এখনও অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও জলবায়ু সংকট নারীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে—যা বাজেট কাঠামোয় পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত নয়। এই অংশে আমরা জাতীয় (ম্যাক্রো) ও স্থানীয় (মাইক্রো) স্তরে উদ্ভূত গুরুত্বপূর্ণ জেন্ডার ইস্যুগুলোকে সংক্ষেপে তুলে ধরছি, যা নীতিনির্ধারণ ও বাজেট সংস্কারে সহায়ক হতে পারে।
🔶 ম্যাক্রো (জাতীয় ও নীতিগত প্রেক্ষাপট) স্তরে উদ্ভূত জেন্ডার ইস্যুসমূহ:
- নারী ও কিশোরী বান্ধব বাজেট উপস্থাপনের দাবির পরও জাতীয় বাজেটে জেন্ডার বরাদ্দের স্বচ্ছতা ও পৃথক বিশ্লেষণ অনুপস্থিত।
- জাতীয় বাজেট নীতিমালায় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন একটি উচ্চারণ হলেও, খাতভিত্তিক বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ অনুপস্থিত (বিশেষত প্রযুক্তি, পরিবেশ, কৃষি)।
- জেন্ডার বাজেটিংকে এখনও ‘সামাজিক সেক্টরের ইস্যু’ হিসাবে দেখা হয়, ফলে অর্থনীতি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ উপেক্ষিত হয়।
- জাতীয় মহিলা উন্নয়ন নীতির হালনাগাদ ও প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, যার ফলে নারীর অধিকার বিষয়ক নীতি বাস্তবায়ন ব্যাহত।
- সরকারী পরিসংখ্যানের মধ্যে জেন্ডার ডেটার স্বল্পতা ও অব্যবস্থাপনা, যার ফলে প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা দুর্বল।
- ডিজিটাল বাংলাদেশ কৌশলে নারীর অন্তর্ভুক্তি কম—ডিজিটাল লিঙ্গ বৈষম্য বাড়ছে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের মধ্যে।
- SDG Gender Indicator-এর অনেকগুলোর (যেমন: শ্রম, স্বাস্থ্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণ) অগ্রগতি অসম ও ধীর।
- নারীর উপর সহিংসতা রোধে বাজেট বরাদ্দ অপর্যাপ্ত এবং সেবা সংস্থার সক্ষমতা সীমিত।
🔶 মাইক্রো (স্থানীয় ও ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট) স্তরে উদ্ভূত জেন্ডার ইস্যুসমূহ:
- স্থানীয় পর্যায়ের বাজেটে নারীর অংশগ্রহণ এখনো প্রতীকী, প্রকৃত মতামত নেওয়া হয় না।
- নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সুরক্ষা ঘাটতি বিদ্যমান।
- জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ বা লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে, কিন্তু স্বাস্থ্য বাজেটে তার প্রতিফলন নেই।
- প্রজনন স্বাস্থ্য, পিরিয়ড স্বাস্থ্য (MHM), SRHR বিষয়ে বাজেট পরিকল্পনা দুর্বল, বিশেষত বিদ্যালয় পর্যায়ে।
- শহর ও গ্রামে নারীর যাতায়াতে নিরাপত্তা সংকট বাজেটে অগ্রাধিকার পায় না (যেমন: নারীবান্ধব গণপরিবহন বা স্ট্রিট লাইটিং)।
- অভিভাবকহীন, বিধবা ও একক নারীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও বাজেট সীমিত।
- নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ বা গ্রান্ট প্রাপ্তির জটিলতা, বিশেষ করে ব্যাংকিং ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায়।
- স্থানীয় সরকারে নারী জনপ্রতিনিধিদের বাজেট প্রস্তাবনা নির্বাচনী এলাকায় স্বীকৃতি পায় না বা পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা প্রতিহত হয়।
৭. সুপারিশ: নারীকেন্দ্রিক বাজেট কাঠামোর রূপরেখা
নিম্নে উল্লিখিত সুপারিশগুলো একটি নারীকেন্দ্রিক, অংশগ্রহণমূলক ও রূপান্তরমূলক বাজেট কাঠামোর জন্য একটি দিকনির্দেশনা প্রদান করে, যা প্রান্তিক নারীদের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জীবিকা, নিরাপত্তা এবং নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেট যেন কেবল সংখ্যার খেলা না হয়ে ওঠে, বরং নারীর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, চাহিদা ও স্বপ্নকে প্রতিফলিত করে—এ লক্ষ্যে এই সুপারিশমালার প্রণয়ন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কাঠামোর জন্য নারীকে কেন্দ্র করে বাজেট পরিকল্পনার এখনই সময়।
i. প্রান্তিক নারীদের বাজেট অধিকার ও চাহিদা নিশ্চিত করুন
- জেলাভিত্তিক নারী-নির্ভর কাজ, জীবনধারা ও স্বাস্থ্য চাহিদার উপর ভিত্তি করে বাজেট বরাদ্দের অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত করুন।
- উপকূল, পার্বত্য, দুর্যোগপ্রবণ ও শহর-বস্তি অঞ্চলে বসবাসরত নারীদের জন্য বিশেষ বাজেট লাইন চালু করুন।
- প্রজনন স্বাস্থ্য, পিরিয়ড স্বাস্থ্য (MHM) ও নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য সুনির্দিষ্ট ও নিরীক্ষণযোগ্য বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করুন।
ii. বিকেন্দ্রীভূত ও অংশগ্রহণমূলক বাজেট পরিকল্পনা গড়ে তুলুন
- ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে নারীবান্ধব বাজেট কর্মশালা ও শুনানি চালু করুন, যেখানে কিশোরী, যুবতী, বিধবা ও একক নারীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক থাকবে।
- স্থানীয় নারী জনপ্রতিনিধি ও নারী নেতৃত্বে বাজেট পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম গঠন করুন।
iii. MEL কাঠামো ও তথ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
- Gender-disaggregated ও geolocation-based ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলুন।
- বাজেট ব্যয় ও প্রভাব মূল্যায়নে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, নারী গবেষক এবং সিভিল সোসাইটির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুন।
iv. উদ্ভাবনী অর্থায়ন ও মাইক্রো অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করুন
- Gender Bond, ফলাফলভিত্তিক অর্থায়ন (Result-Based Financing) এবং নারী ফোকাসড ক্লাইমেট ফান্ড চালু করুন।
- ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কমিউনিটি সীড ফান্ড ও প্রযুক্তি-সহায়ক মাইক্রো ক্রেডিট প্রোগ্রাম চালু করুন।
v. জীবিকা, নিরাপত্তা ও সহায়তায় নারীর প্রবেশাধিকার বাড়ান
- গ্রামীণ নারী, শহুরে দরিদ্র নারী ও কিশোরীদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আইটি ল্যাব ও স্টার্টআপ হাব গড়ে তুলুন।
- নারী নিরাপত্তা কেন্দ্র, গর্ভকালীন ও প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সাপোর্ট সেল ও হেল্পলাইন চালু করুন।
vi. ভবিষ্যতের বাজেট: নারী শুধু সুবিধাভোগী নয়, নীতিনির্ধারক
২০২৫–২৬ অর্থবছরের জেন্ডার বাজেট যেন হয় সংখ্যা-নির্ভর নয়, বরং নারীর জীবন, সংগ্রাম ও স্বপ্নের প্রতিফলন। এই বাজেট হতে হবে একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের দৃষ্টান্ত, যেখানে নারীরা কেবল সুবিধাভোগী নয়, নীতিনির্ধারক, উদ্ভাবক ও পরিবর্তনের চালিকা শক্তি।
উপসংহার
জেন্ডার বাজেট যেন কেবল একটি কাগুজে পরিকল্পনা নয়—এটি যেন হয় নারীর জীবনের অনুভবযোগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম। যেখানে প্রতিটি বরাদ্দ নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সম্ভাবনার জন্য কাজ করে। নারী শুধু সুবিধাভোগী নয়, নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে যেন থাকেন।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায় আমরা চাই একটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তন, যেখানে নারীর কণ্ঠ, জীবন ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও লিঙ্গ-সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ার প্রেক্ষিতে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালু হয়েছে—যা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন। একই সঙ্গে সমাজে দীর্ঘদিন অবহেলিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নাগরিক অধিকার, কর্মসংস্থানের সুযোগ ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া যৌনকর্মীদের ‘শ্রমজীবী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নও এখন জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে, যা লিঙ্গ-ভিত্তিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি সাহসী পদক্ষেপ।
এই প্রেক্ষাপটে, জেন্ডার বাজেট কেবল নারীর জন্যই নয়—বরং সকল লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার নিশ্চয়তার জন্য হতে হবে। একটি সমানুভূতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে জেন্ডার বাজেট হবে রাষ্ট্রের একটি কার্যকর হাতিয়ার।
